নাথুরাম গডসে কিভাবে গান্ধীজিকে হত্যা করেছিল ? History of Mahatma Gandhi

নাথুরাম গডসে কিভাবে গান্ধীজিকে হত্যা করেছিল ? History of Mahatma Gandhi

নাথুরাম গডসে কিভাবে গান্ধীজিকে হত্যা করেছিল ? History of Mahatma Gandhi


মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকাণ্ড: নাথুরাম গডসের দৃষ্টিকোণ ও ইতিহাসের মূল্যায়ন

৩০শে জানুয়ারি ১৯৪৮, সন্ধ্যা ৫:১৫।
মহাত্মা গান্ধী দিল্লির বিড়লা হাউস থেকে প্রতিদিনের মতো প্রার্থনা সভার উদ্দেশ্যে রওনা হন। তিনি পায়ে হেঁটে সামনে থাকা প্রার্থনা মঞ্চের দিকে যাচ্ছিলেন, যেখানে প্রতিদিন তাঁর অনুসারীরা সমবেত হতেন। কিন্তু সেই সন্ধ্যায় ঘটল ভারতের ইতিহাসের অন্যতম কালো অধ্যায়।

ভিড়ের মধ্য থেকে নাথুরাম গডসে হঠাৎই বেরিয়ে আসেন। মুহূর্তের মধ্যে তিনি পকেট থেকে বের করেন একটি পিস্তল এবং কাছ থেকে গান্ধীজিকে লক্ষ্য করে তিনটি গুলি করেন। গুলি লেগে মুহূর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন মহাত্মা। তাঁর মুখ থেকে শেষ কথা ছিল – "হে রাম"।

অবাক করা বিষয় হলো, নাথুরাম গডসে গুলি চালানোর পরেও পালানোর কোনো চেষ্টা করেননি। বরং, তিনি গ্রেফতার হওয়ার পর কোর্টে দাঁড়িয়ে স্বীকার করেছিলেন, "হ্যাঁ, আমি গান্ধীজিকে হত্যা করেছি, এবং আমার এই কাজের পিছনে যুক্তি আছে"।

নাথুরাম গডসে কে ছিলেন?

নাথুরাম বিনায়ক গডসে ছিলেন এক সময়ের গান্ধীভক্ত। তিনি হিন্দু মহাসভার সক্রিয় সদস্য ছিলেন এবং "হিন্দু রাষ্ট্র" নামে একটি সংবাদপত্র পরিচালনা করতেন। গান্ধীজির অহিংসা নীতি ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে তিনি ক্রমাগত অসন্তুষ্ট হয়ে পড়েন। বিশেষ করে, ভারত বিভাগের পর গান্ধীজির ভূমিকা ও পাকিস্তানকে ৫৫ কোটি টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত তাঁকে আরও ক্ষুব্ধ করে তোলে।

গান্ধীজির বিরুদ্ধে নাথুরামের অভিযোগ কী ছিল?

নাথুরাম গডসে কোর্টে দাঁড়িয়ে একটি ৯৩ পৃষ্ঠার বিবৃতি দেন, যেখানে তিনি ব্যাখ্যা করেন কেন তিনি গান্ধীজিকে হত্যা করেছেন। তাঁর অভিযোগগুলোর মধ্যে কয়েকটি ছিল –

  1. গান্ধীজি কংগ্রেসকে এককভাবে পরিচালনা করতেন – ১৯২০ সালে বাল গঙ্গাধর তিলকের মৃত্যুর পর গান্ধীজি কংগ্রেসের সর্বেসর্বা হয়ে ওঠেন। তাঁর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কেউ মতামত দিলে, তা গ্রাহ্য করা হতো না।

  2. অহিংসার নামে দুর্বলতা সৃষ্টি – গডসের মতে, অহিংসা দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব নয়। তিনি যুক্তি দেন, যদি অহিংসাই শ্রেষ্ঠ উপায় হতো, তবে শ্রী রাম কেন রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলেন? শ্রীকৃষ্ণ কেন অর্জুনকে কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধ করতে বললেন?

  3. ভারত বিভাগের জন্য গান্ধীজি দায়ী – দেশভাগের সময় গান্ধীজি পাকিস্তানপন্থী নীতি গ্রহণ করেছিলেন বলে নাথুরামের অভিযোগ। তিনি দাবি করেন, গান্ধীজি সবসময় মুসলিমদের পক্ষ নিয়েছেন, হিন্দুদের স্বার্থ উপেক্ষা করেছেন।

  4. পাকিস্তানকে ৫৫ কোটি টাকা দেওয়ার চাপ সৃষ্টি – দেশভাগের পর পাকিস্তানকে ৭৫ কোটি টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। প্রথমে ২০ কোটি টাকা দেওয়া হলেও, কাশ্মীর দখলের জন্য পাকিস্তানের আগ্রাসনের কারণে ভারত সরকার বাকি ৫৫ কোটি টাকা আটকে রাখে। কিন্তু গান্ধীজি অনশন শুরু করলে ভারত সরকার বাধ্য হয় পাকিস্তানকে এই টাকা দিয়ে দিতে।

নাথুরাম গডসের বিচার ও শাস্তি

গান্ধীজির হত্যার পর মোট ৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল, যাদের মধ্যে ছিলেন –

  • নাথুরাম গডসে
  • নারায়ণ আপটে
  • মদনলাল পেহভা
  • দিগম্বর বাগরে
  • বিষ্ণু কারে
  • গোপাল গডসে (নাথুরামের ভাই)
  • বিনায়ক সাভারকার

১৯৪৯ সালের ৮ই নভেম্বর আদালত নাথুরাম গডসে ও নারায়ণ আপটেকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন। ১৯৪৯ সালের ১৫ই নভেম্বর পুনের আম্বালা জেলে নাথুরাম গডসের ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

গান্ধীজি কেন হত্যার শিকার হলেন?

গান্ধীজি আজও বিশ্বের অন্যতম মহান নেতাদের একজন। তিনি অহিংসার মাধ্যমে স্বাধীনতা আন্দোলনকে পরিচালিত করেছেন, যা আজও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনুপ্রেরণা দেয়। কিন্তু তবুও কিছু মানুষ তাঁকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখে।

কিছু মানুষ মনে করেন, গান্ধীজির রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোর কারণে দেশভাগের সময় হিন্দুরা বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল। আবার অনেকে মনে করেন, গান্ধীজি যদি না থাকতেন, তাহলে ভারত স্বাধীনতা অর্জনে আরও বেশি সময় লাগত।

উপসংহার

নাথুরাম গডসে গান্ধীজিকে হত্যা করে তাঁর প্রতিবাদ প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, হিংসার মাধ্যমে কোনো মহান আদর্শকে শেষ করা যায় না। গান্ধীজির আদর্শ আজও বিশ্বজুড়ে আলোচিত এবং অনুপ্রেরণা হিসেবে বিবেচিত।

এই হত্যাকাণ্ড শুধুমাত্র একজন মহান নেতার জীবন কেড়ে নেয়নি, এটি ভারতের ইতিহাসের গতিপথকেও বদলে দিয়েছে। গান্ধীজি ছিলেন অহিংসার প্রতীক, আর তাঁর মৃত্যু যেন সেই আদর্শের পরীক্ষার দিন হয়ে উঠেছিল।

আপনার মতামত কী? আপনি কি মনে করেন গান্ধীজি সত্যিই পক্ষপাতদুষ্ট ছিলেন, নাকি তিনি ভারতের সত্যিকারের এক মহান নেতা? কমেন্টে জানাতে ভুলবেন না!

Post a Comment

Previous Post Next Post